আমাদের বাড়ির সামনের বাগানে রয়েছে একটি ছোট প্রকল্প, যার নাম ‘মিনি স্ট্রিট লাইব্রেরি’। এখানে আমরা পড়া হয়ে যাওয়া বইগুলি প্রতিবেশী এবং অন্যান্যদের সঙ্গে শেয়ার করি। বাস্তবে, একবার পড়া হয়ে যাওয়া বইগুলি বইয়ের তাকে রেখে শুধু ধুলো জমিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছুই করে না। তার চেয়ে বইগুলি অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা অনেক ভালো।
আমার দুই মেয়ে ইসরা এবং ইনায়াতের বইয়ের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার জন্য এই লাইব্রেরি শুরু হয়েছিল। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল ফোনের এই যুগে বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখা আমাদের বড়দের মতো পক্ষে যেখানে বিশাল সমস্যা, সেখানে আর ছোটদের কথা কী বলব।
প্রথম দিন আমরা লাইব্রেরিতে বড়দের জন্য আত্মজীবনী এবং ভ্রমণকাহিনি (আমার প্রিয় দুটি বিষয়) এবং ছোটদের জন্য মেয়েদের কিছু কিশোর উপন্যাস, ছোটদের জন্য প্রাথমিক বই রেখেছিলাম। খুব দ্রুত এই স্ট্রিট লাইব্রেরিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই এই লাল বাক্সে পছন্দের কোনো বই খুঁজে নেন বা পড়া হয়ে যাওয়া নিজেদের কোনো বই অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার জন্য রেখে যান। এই লাইব্রেরি এখন আমাদের কমিউনিটির দৈনন্দিন জীবনের একটি প্রিয় অংশ হয়ে উঠেছে। মাঝেমধ্যে এই ছোট বাক্সে এত বই জমা হয় যে কিছু বই ঘরে এনে রাখতে হয়, যাতে ছোট লাইব্রেরিটি ভেঙে না যায়।
ঐতিহ্যবাহী ধারার বাইরেও কত বিভিন্ন বিষয়ের বই আসে আমাদের স্ট্রিট লাইব্রেরিতে। সপ্তাহান্তের একটি সকালে বই গুছানোর সময় পেলাম ‘Could do better’ নামে একটি বই। বিশ্বের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের স্কুল রিপোর্ট নিয়ে এই বই। বইটি দেখার আগে আমার ধারণায়ও ছিল না যে শিক্ষকদের দেওয়া স্কুল রিপোর্ট নিয়ে এ রকম একটি প্রকাশিত বই থাকতে পারে।
শিক্ষকদের এই রিপোর্ট আসলে সবার জীবনে মা-বাবা বা পরিবারের বাইরে থেকে করা প্রথম নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া। পশ্চিমে পড়াশোনা শেষে চাকরিজীবনেও তা অব্যাহত থাকে বার্ষিক মূল্যায়ন নামে। নিয়োগকর্তাকে সৎ এবং গঠনমূলক আলোচনা করতে হয় নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে। নিজের ক্যারিয়ারের পরের ধাপে কীভাবে যেতে হবে, এ সব বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু স্কুল রিপোর্ট হোক বা কর্মক্ষেত্রের রিপোর্ট, সব জায়গায় মূল লক্ষ্য বরাবরই ‘Could do better’।
এই বইয়ের কিছু স্কুল রিপোর্ট বেশ মজার ছিল আবার কিছু রিপোর্ট দেখে বোঝা গিয়েছিল শিক্ষকরা সত্যিই ওই ছাত্র বা ছাত্রীর জন্য চিন্তিত ছিলেন। প্রিন্সেস ডায়ানার রিপোর্ট কার্ডে শিক্ষকের মন্তব্য ছিল ‘She must try to be less emotional in her dealings with others’। বহু বছর পর এই জনপ্রিয় রাজকন্যার জীবনের সব জটিলতার কারণ যেন দৈবক্রমে জানা ছিল ওঁর এই শিক্ষকের।
বিখ্যাত গায়ক জন লেননের শিক্ষক তাঁর ওপর এতই অসন্তুষ্ট ছিলেন যে লেনন যে বানের জলে ভেসে যাচ্ছেন, তা রিপোর্টে উল্লেখ করতে ভোলেননি। তবে সৃষ্টিশীল মানুষরাই তো যুগে যুগে এভাবেই ছন্নছাড়াই থাকেন।
উইনস্টন চার্চিলের শিক্ষকেরা প্রায়ই উল্লেখ করতেন যে তিনি ‘নিয়মিতভাবে অনিয়মিত’—নিয়ম ভঙ্গকারী এবং প্রায়ই দেরি করে ক্লাসে আসতেন। মজার বিষয় হলো, এই অস্থির ছাত্রই একদিন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে মিত্রপক্ষের নেতৃত্ব দেন। শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ যে সব ভুল ছিল, তা কিন্তু নয়। উইনস্টন চার্চিল তাঁর ভুল নীতির কারণে, বিশেষ করে বেঙ্গল দুর্ভিক্ষের মতো ঘটনার জন্য লাখ লাখ মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল উপমহাদেশে। চার্চিল ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করেছেন সারা জীবন, তাঁর শিক্ষকের রিপোর্টের মতোই তিনি ছিলেন নিয়মিতভাবে অনিয়মিত। ডিপ্রেশন খারাপ হলে এক মানুষ, ভালো থাকলে অন্য রকম।
আগামী 5 অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বের সব শিক্ষকের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা জানাই। নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে তাঁদের পর্যবেক্ষণ এবং অন্তর্দৃষ্টি কীভাবে ভবিষ্যৎকে আকার দেয়, তা সত্যিই অসাধারণ। মা-বাবা যখন সন্তানদের ছোট-বড় সাফল্যে ব্যাপক খুশি হন, তখন শুধুমাত্র শিক্ষকেরাই বলে ওঠেন আরও ভালো করা চাই, মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে না ‘You could do better’।