• বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪০ অপরাহ্ন |

পূজার রেশ

**দুর্গার স্মৃতি: কৈশোর ও যৌবনের আনন্দময় দিনগুলো**

আশির দশকের সেই সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশে আমরা বড় হয়েছি। আমাদের শিক্ষক ও সহপাঠীদের অনেকেই ছিলেন হিন্দু। এমনকি প্রতিবেশীরাও ছিলেন হিন্দু। আমরা মুসলিম ছেলেদের তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। আসলে আমরা কোনদিনই ভাবিনি যে তারা হিন্দু আর আমরা মুসলমান। আমাদের সম্পর্ক ছিল সামাজিক, গভীর সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির। অন্য আট-দশজন মুসলিমের সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল, সে রকমই সম্পর্ক ছিল হিন্দু শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে। দারুণ বন্ধুত্ব ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। একে অপরের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল। আর তা বেশি হতো দুর্গাপূজা এলে। কারণ, এ পূজাটি বাংলাদেশের হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব।

এখন এই চর্চা আছে কিনা জানি না। আমাদের সময়ে দুর্গাপূজা এলে আমরা হিন্দু শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুদের বাসায় নিমন্ত্রণ পেতাম। মাইজদীতে আমাদের স্কুলের নাম ছিল কল্যাণ হাই স্কুল। হেড স্যার থেকে শুরু করে অধিকাংশ শিক্ষকই ছিলেন হিন্দুধর্মাবলম্বী। হেড স্যার বিমলেন্দু মজুমদার ছিলেন শহরের খুব নামকরা শিক্ষাবিদ। আমাদের সহকারী হেড স্যারও ছিলেন হিন্দু। লোকেন্দ্র স্যার। তা ছাড়া ইংরেজির পরিমল স্যার, অঙ্কের বিশ্বজিৎ স্যার ও ভক্তি স্যার, বাংলার যোগেশ স্যার, বুককিপিংয়ের অমূল্য স্যার—তাঁরা সবাই ছিলেন হিন্দুধর্মাবলম্বী। বলতে গেলে আমি মানুষ হয়েছি হিন্দু স্যারদের সাহচর্যেই। তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কিছু কিছু ঋণ জীবনেও শোধ করা যায় না। যেমন শিক্ষকদের ঋণ।

পূজা এলে এসব শিক্ষকের বাসায় আমাদের নিমন্ত্রণ থাকত। স্যাররা বলতেন, ‘তোরা বাসায় আসিস।’ আমরা সহপাঠীরা দল বেঁধে যেতাম। মজার মজার সন্দেশ খেতাম। নারকেলের নাড়ু খেতাম। বিমল স্যারের স্ত্রী, লোকেন্দ্র স্যারের স্ত্রী ও অমূল্য স্যারের স্ত্রী আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মাসি বলে ডাকতাম। প্রাইভেট পড়ার সুবাদে তাঁদের বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। ফলে সম্পর্কটা আর ছাত্র-শিক্ষক থাকেনি। পরিবারের সদস্য হয়ে গিয়েছিলাম। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাদের স্নেহধন্য হওয়ার।

আমাদের স্কুলের পাশেই ছিল পূজামণ্ডপ। নাম দেবালয়। পূজা শুরু হওয়ার আগে যখন প্রতিমা বানানো শুরু হতো, তখন আমরা টিফিনের ফাঁকে দেবালয়ে প্রতিমা দেখতে যেতাম। মাটি কেটে কেটে কারিগররা মানুষ, পশু, পাখি তৈরি করছেন—কী যে নৈপুণ্য ছিল সে কাজে, আহা! আমি মুগ্ধ হয়ে তাদের নির্মাণশৈলী দেখতাম। দেবী দুর্গা—কী চোখ, কী নাক, কী তার অঙ্গসৌষ্ঠব—চোখ সরানো দায় ছিল। দেবী দুর্গার চোখ দুটি থাকত বিস্ফারিত। হাতে অস্ত্র। তিনি অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা করেন বলেই বিশ্বাস করা হয়।

তবে দেবী দুর্গা মানুষের মতো হলেও একটু ব্যতিক্রম ছিলেন। তাঁর হাত ২টি নয়, ১০টি। ১০ হাতে ১০টি অস্ত্র থাকত। আর চোখ তিনটি। তৃতীয় চোখটি কপালে। তিনটি চোখেরও ব্যাখ্যা আছে। এখন আর মনে নেই। অনেক আগে শোনা কাহিনি। পুরোপুরি কিছুই মনে করতে পারছি না। তবে যত দূর মনে আছে—মহিষাসুরকে বধ করতে পুরুষ দেবতারা অক্ষম ছিলেন বলেই সব দেবতার শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করা হয় দেবী দুর্গাকে। দুর্গার ১০ হাতে যে ১০টি অস্ত্র, এগুলোর আলাদা আলাদা নাম আছে। নামগুলো আজ আর মনে করতে পারছি না। তবে তীর-ধনুক ও তলোয়ার ছিল, যা দিয়ে দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করার দৃশ্য প্রতিমায় ফুটিয়ে তোলা হতো। এই যে অশুভকে বধ করার বার্তা—এ বার্তাটি সেই কৈশোরে আমাকে অভিভূত করেছিল সবচেয়ে বেশি।

আমাদের ক্লাসমেটদের মধ্যে যারা হিন্দু ছিল, পূজায় ওদের বাড়িতেও আমার নিমন্ত্রণ থাকত। আমি বলছি ৩৬ বছর আগের কথা। এখনো ওদের অনেকের নাম মনে আছে। সাথী, রিক্তা, মাধব, কমল, রানা, জুয়েল, আরো অনেক ক্লাসমেট, যাদের বাড়ি ছিল স্কুলের আশপাশেই। আমরা পূজার ছুটিতে দেবালয়ে পূজা দেখে সন্ধ্যায় দল বেঁধে ওদের বাড়িতে যেতাম। মজার মজার প্রসাদ খেতাম। গুড় দিয়ে তৈরি নারকেলের নাড়ুটা আমার ভীষণ পছন্দ ছিল। মাসিরা খুব যত্ন করে খাওয়াতেন। প্রায় সব বাড়িতেই ব্যবহার করা হতো তামা, কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র। একেবারে ঝকঝকে তকতকে। পূজা উপলক্ষে বাড়ি ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে রাখতেন তাঁরা। সন্ধ্যায় ধূপ জ্বালাতেন। ধূপের ঘ্রাণে পুরো বাড়িতে এক অদ্ভুত মোহনীয় পরিবেশ তৈরি হতো। প্রায় প্রতিটি ঘরের কোণে তুলসীগাছ থাকত। তুলসীগাছ দেখলে আমি পাতা না ছিঁড়ে থাকতে পারতাম না। কারণ,


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *