• শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন |

প্রবাসে লক্ষ্মীপূজা: নাড়ুর অভাবে পুজোর আসর অসম্পূর্ণ

চিত্রাগুচ্ছে যে নারিকেলের ছাড়া আর বিশেষ ধরনের ফল পাওয়া যায় না, তার মধ্যে কুমড়া, পেয়ারা, আতা এবং কলা—এগুলি পাওয়া যায়। কিন্তু আম, জাম, কাঁঠাল, আর নারিকেলের গাছের দেখা বাড়িতে ঘটত না। আবার পুরোনো চরে ভাঙনের পরে নতুন চরে সংসার গড়লে সেগুলি বড় হয়ে ওঠতে সময়ও লাগে। আবার যদিও আম, জাম, কাঁঠাল, আর নারিকেলগাছ লাগানো হলেও ততদিনেও সেগুলি ফল দেওয়া শুরু করেনি। তাই হাটে থেকে এনে তা খাওয়া হত কিংবা এগুলি দিয়ে বিভিন্ন খাবার তৈরি করে খাওয়া হত।

বছরের মাঝে এক সময় হাট থেকে নারিকেল কেনা হত নাড়ু তৈরি করার জন্য। সেই নারিকেলের কয়েকটি বয়স খুব বেশি হয়ে যাওয়ায় সেগুলির মধ্যে “ফোপরা” গজিয়ে যেত। হলুদ রঙের তুলতুলে ফোপরাটি খেতে দারুণ হত। আমরা ছোটরা সেটিকে বাটিতে নিয়ে খেয়ে বেড়াতাম। তবে নারিকেল দিয়ে তৈরি করা যে খাবারটার জন্য আমরা সবাই বছর ভর অপেক্ষা করে থাকতাম তা হল নারিকেলের নাড়ু। পিতা-মামারা নারিকেলের ছোবড়া ছাড়িয়ে সুদ্ধ নারকেলটি যেন টেকো মাথার মতো তেলতেলে পরিষ্কার করে ফেলতেন।

আমরা ছোবড়াটি মাথায় মুকুটের মত পরে খেলাধুলা করতাম। সেই তেলতেলে নারিকেলের সুদ্ধটিকে ভেঙে তার জলটি একটা গ্লাসে সংগ্রহ করা হত। সেটিকে আমরা তেমনিই এমনি এমনি খেতাম। এরপর শুরু হত মায়ের কাজ। নারিকেলের সুদ্ধটি নারিকেল কোরার ওপর ধরে দিয়ে, দক্ষতার সঙ্গে নারিকেলের সুদ্ধ থেকে সব নারিকেল ছাড়িয়ে নিতেন। সেই কোরা নারিকেলগুলি দেখতে হত অনেকটা সুজিমাখনের মতো।

এদিকে নারিকেল কেওরা হচ্ছে, অন্যদিকে মাটির চুলাতে একটা পাতিলে পানি ফেলে দেয়া হচ্ছে। পানি গরম হলে তার মধ্যে গুড়ের পাটালি ছাড়া হয়। এরপর জ্বাল দিয়ে জ্বাল দিয়ে গুড়ের পেস্ট তৈরি করা হত। তারপর তার মধ্যে কোরা নারিকেলটি ছেড়ে দেয়া হত। তারপর জ্বাল ঠেকানো হত যতক্ষণ না নারিকেল এবং গুড়ের মিশ্রণটা হাতে নিয়ে রাখলে সেটি গোলা আকার ধারণ করতে পারে। কিছু সময় পর পর সামান্য পরিমাণে হাতে নিয়ে তোলেন মায়েরা সেটিকে নিজেদের হাতের তালুতে নিয়ে দেখতেন যে সেটা দিয়ে গোলা তৈরি করা যাচ্ছে কি না। আমরা ছোটরা গোলাকারে হাতের তৈরি কাগজে নারিকেলের নাড়ু নিয়ে চুলার পাশে বসে অপেক্ষা করতাম, কবে নাড়ু তৈরি হবে।

এভাবে চলতে চলতেই এক সময় নাড়ু তৈরি হয়ে যায়। আমরা তৈরি কাগজের মধ্যে নাড়ু নিয়ে ঘুরে ঘুরে এটিকে খেয়ে বেড়াতাম। কার নাড়ু সবার পরে শেষ হবে সেটিকে নিয়ে মনে মনে একপ্রকার প্রতিযোগিতা চলতো। কেননা, তখনই সেই ব্যক্তি অন্যদের দেখাতে দেখাতে খেতে পারবে। নাড়ু পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেলে সেগুলিকে শুকিয়ে মুড়ির কৌটোর মধ্যে সংরক্ষণ করা হত। পুরোনো দুধের কৌটোগুলি ফেরিওয়ালাদের থেকে ক্রয় করা হত এবং সেগুলির মধ্যে মুড়ি রাখা হত আর তার ভিতরে নাড়ু রাখা হত। আমরা ছোটরা মাঝে মাঝে চুরি করে সেগুলিকে খেয়ে ফেলতাম। মুড়ি, আর নাড়ু ছিল গ্রামের দিনের বেলাকার নাস্তা। বিশেষ করে ক্ষেতের কাজ শেষ করে যখন পুরুষরা ঘরে ফিরত তখন তাদেরকে এক বাটি নাড়ু মুড়ি, আর এক গ্লাস পানি দিয়ে আপ্যায়ন করা হত।

পরে নদী ভাঙনের জেরে আমরা চর ভবানীপুর থেকে কুষ্টিয়ার শহরতলি বাড়াদিতে চলে এলাম পুরো পরিবার নিয়ে। সেখানে এসে আর নারিকেল কিনতে হত না। কেননা, আমরা দুই ভাই অন্যের বাড়ির গাছের তলা থেকে নারিকেল সংগ্রহ করে এনে দিতাম। সকালে ঘুম থেকে জেগে নির্দিষ্ট গাছতলাতে গিয়ে অপেক্ষা করতাম। আমাদের সমবয়সি আশেপাশের সব বাচ্চারাও এই কাজটি করত। তাই সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতাও চলত। কিন্তু আমরা দুই ভাই পেছনে পেছনে হওয়ায় অন্যরা আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারত না। আবার আমরা ভালো গাছে চড়তে পারতাম। তাই অন্যের বাড়ির গাছ থেকে নারিকেল পেড়ে দিলে তারা বিনিময়ে আমাদের নারিকেল দিতেন। এইভাবেও আমাদের নারিকেল যোগাড় হত। এর বাইরে আরও একটি উপায়ে আমাদের নাড়ুর যোগান হত।

তা ছিল আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের থেকে। আমাদের বাড়ির এক বাড়ি পরেই ছিল বলাই দাদু আর কেশরী দাদুর বাড়ি। তাদের দুই ভাইয়ের বাড়ি পাশাপাশি। তাদের ছেলেমেয়ে, নাতি নাতনিরা সব মিলিয়ে অনেকগুলি ছেলেমেয়ে। বছরের প্রায় সময়টাই তাদের বাড়িতে অনেক মানুষের দেখা পাওয়া যেত। পূজার সময় আরও বেশি দেখা পাওয়া যেত। দুর্গাপূজার পর লক্ষ্মীপূজা আসে। লক্ষ্মীপূজার নাড়ু, মুড়ি, মুড়কি সংগ্রহ করার চল ছিল আমাদের মধ্যে। আমরা আবার লজ্জা পেত এগুলিকে সংগ্রহ করতে যেতে। তাই বলাই দাদু আর কেশরী দাদুর স্ত্রীরা, যাদের আমরা কর্তা বলে ডাকতাম, তারা পালাক্রমে আমাদের বাড়িতে এসে নাড়ু, মুড়ি, মুড়কি এসে দিতেন।

সারা বছর ধরে আমরা দুর্গাপূজার চেয়ে লক্ষ্মীপূজার জন্য বেশি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম নাড়ু খাওয়ার জন্য


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *