প্রথমেই আন্তরিক অভিনন্দন জানাতে চাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে, এই ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়ের জন্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের যে আস্থা ও সমর্থন তারা অর্জন করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক মাইলফলক। এই মুহূর্তে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে, যার জাতীয়তাবাদী দর্শন, আত্মনির্ভরশীলতার চেতনা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। একইসঙ্গে স্মরণ করছি আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলকে সংগঠিত ও সুসংহত রেখেছিলেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে অবিচল অবস্থান নিয়েছিলেন।এই বিজয় শুধু একটি দলের নয়; এটি লাখো মানুষের প্রত্যাশা, সংগ্রাম ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তাই এই মুহূর্ত আত্মতৃপ্তির নয়, দায়িত্ব গ্রহণের; রাষ্ট্র পুনর্গঠনের; এ বিজয় বিভাজনের নয়, ঐক্যের। জনগণ যে আস্থা দিয়েছে, সেটিকে সম্মান জানিয়ে এখন সময় রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রজ্ঞা, সহনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের পরিচয় দেওয়ার।এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ক্ষমতা থেকে দেশসেবার মহান দায়িত্ব পালনের যাত্রা কত দ্রুত ও কতটা আন্তরিকভাবে শুরু করা যায়।
বাংলাদেশ আজ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা – সব মিলিয়ে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। নতুন সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত একটি স্পষ্ট, সময়বদ্ধ এবং জবাবদিহিতামূলক জাতীয় রোডম্যাপ ঘোষণা করা, যেখানে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মানবিকতার সমন্বয় থাকবে।
এই রোডম্যাপের কেন্দ্রে রাখা দরকার আমাদের যুবসমাজকে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু কেবল সংখ্যায় বড় হলেই হবে না; দক্ষতায় বড় হতে হবে। জাতীয় স্কিল ডেভেলপমেন্ট মিশনের মাধ্যমে আইটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, কারিগরি শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে ডিগ্রি নয়, দক্ষতা কর্মসংস্থানের চাবিকাঠি হয়। তরুণদের জন্য স্টার্টআপ তহবিল, গবেষণাখানে অনুদান, সহজ ঋণ এবং নীতিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে “চাকরিপ্রার্থী” থেকে “চাকরিদাতা” তৈরির স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারও সময়ের দাবি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষা পরীক্ষামুখী ও মুখস্থনির্ভর। এখন প্রয়োজন জীবনমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষা। কারিকুলামে মানসিক স্বাস্থ্য, নাগরিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, প্রযুক্তি ব্যবহার, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও জীবনদক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে মূলধারায় না আনলে বেকারত্ব কমবে না। একইসঙ্গে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন অপরিহার্য।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে বাস্তব প্রণোদনা, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু নির্যাতন ও অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে এধরনের উদ্যোগগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল, দলীয়করণের মাধ্যমে জনগণের সেবার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকেন্দ্রিক সুবিধা প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় তার দুর্বলতম নাগরিকের নিরাপত্তায়। এই খাতগুলো নতুনভাবে গুছিয়ে জনগনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য আজ এক নীরব সংকট। বেকারত্ব, সামাজিক চাপ, ডিজিটাল আসক্তি ও পারিবারিক অস্থিরতা তরুণদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। আত্মহত্যা একটা গুরুতর কিন্তু নিরব সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নিয়ে ইতিপূর্বে কোন সরকারী উদ্যোগ নেওয়া হয় নাই। জেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি যারা দীর্ঘদিন ধরে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে আসছে, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো প্রয়োজন। একটি সমন্বিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে হেল্পলাইন, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, কমিউনিটি সচেতনতা এবং গবেষণা একসাথে কাজ করবে। এ ধরনের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হলে তা হবে মানবিক রাজনীতির একটি শক্তিশালী উদাহরণ।
অর্থনৈতিক খাতে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, দুর্নীতিবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা, সহজ ব্যবসা নিবন্ধন এবং স্বচ্ছ করনীতি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি-স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। একইসঙ্গে রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করতে হবে। গার্মেন্টসের বাইরে ফার্মাসিউটিক্যাল, আইটি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও ব্লু ইকোনমিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) সহায়তা ছাড়া কর্মসংস্থান বিস্তৃত হবে না।
প্রবাসী কল্যাণ ও কূটনৈতিক সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শ্রমিক রপ্তানি, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
পরিবেশ ও কৃষির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নদী সংরক্ষণ, বনায়ন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করলে খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
তবে উন্নয়নের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনর্গঠন। নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়েছেন এবং বিরোধীদলে রয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা অপরিহার্য। বিগত সরকারের সময় বিশেষ করে জুলাই ২০২৪ এ প্রশাসনের পাশাপাশি বেশ কিছু সরকারী-বেসরকারী সংস্থা সরকারী নির্দেশে জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো যা কোনভাবেই কাম্য ছিলোনা। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন বিরোধী কণ্ঠ নিরাপদ থাকে। এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সবসময়ই গণতন্ত্র এবং সবার নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করে এসেছে।অতীতে যারা রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা বা প্রশাসনিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, তাদের খোঁজ নেওয়া এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কাঠামো গঠন করে অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা গেলে ন্যায়বিচারের বার্তা যাবে এবং প্রতিহিংসার চক্র ভাঙার সুযোগ তৈরি হবে।
বেসরকারি সংগঠনগুলোর ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু সংগঠন পূর্ববর্তী সরকারের প্রভাবের অধীনে থেকে জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থে বেশি মনোযোগী ছিল। অন্যদিকে, অনেক নিঃস্বার্থ ও তৃনমূল সংগঠন দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছে। নতুন সরকারের উচিত একটি স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে প্রকৃত জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পায়। রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্পর্ক হওয়া উচিত অংশীদারিত্বের, নিয়ন্ত্রণের নয়।সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হবে না। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, দ্রুত বিচার, মেধাভিত্তিক প্রশাসনিক নিয়োগ, শক্তিশালী সংসদীয় সংস্কৃতি এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের নিরাপত্তা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত।সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। উন্নয়ন যেন কোনো সম্প্রদায়ের জন্য বঞ্চনার কারণ না হয়, এটি নিশ্চিত করতে হবে। বৈচিত্র্যের মধ্যেই বাংলাদেশের শক্তি।স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ জোরদার করতে হবে। স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধানই উন্নয়নের গতি বাড়াবে।সবশেষে, একটি সরকার তখনই ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে, যখন সে নিজের সমর্থকদের নয়, সকল নাগরিকের সরকার হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপির সামনে আজ সুযোগ রয়েছে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সংলাপ, সংস্কার ও মানবিকতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার। বিজয়কে অর্থবহ করতে হলে তা হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্রগঠনের মাধ্যমে।
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সুশাসনের উত্তরাধিকার দীর্ঘস্থায়ী। এখন সময় আস্থা ফিরিয়ে আনার, এখন সময় রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে জনগণের করে তোলার। এখন সময় জনগণের ভালোবাসার প্রতিফলন দেখানোর।
আতিকুর রহমান
চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআই সংস্কার পরিষদ, লিয়াজু এন্ড মিডিয়া কমিটি