• শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৪ অপরাহ্ন |

বাংলাদেশে কি দায়মুক্তির নতুন ধারা?

**দায়মুক্তির ধারা: বাংলাদেশে নতুন কিছু না**

এটা ২০০৯ সালের ঘটনা। গ্যেটে ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রণে করাচি গিয়েছিলাম ‘মাইগ্রেশন’ নিয়ে একটি সেমিনারে অংশ নিতে। সেমিনার শেষে আরও কয়েকটি সভায় বক্তৃতা করার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। এর মধ্যে একটি সভার আয়োজন করেছিল একটি সুশীল সমাজ সংস্থা। সভায় উপস্থিত ছিলেন করাচির অনেক জ্ঞানী-গুণী, সাংবাদিক এবং রাজনীতিক। শ্রোতাদের মধ্যে একজন আমার দিকে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ১৯৭১ সালের ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ বিচার সম্পর্কে আমার মতামত কী?

তখন ঢাকায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার বিচারের দাবি নতুন করে উঠেছিল। এই খবর পাকিস্তানের গণমাধ্যমে বেশ উচ্চস্বরে প্রচার হচ্ছিল। উপস্থিত শ্রোতাদের অনেকেই আমার পরিচিত, বন্ধু ছিলেন। পাকিস্তানের নাগরিক সমাজের যে কজন উদারপন্থী এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ ছিলেন, তাদের কয়েকজন ছিলেন আমার এই বন্ধুরা।

১৯৭১ সাল সম্পর্কে আমার অনুভূতি মিশ্র। আমি ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসি জুলাই মাসের শেষের দিকে। নিজের চোখেই অনেক কিছু দেখেছি। মেঘনার পাড় দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম নদীতে ভাসমান লাশ। কত মানুষ যে মারা গিয়েছে, কোনোদিন তা গুনে দেখার চেষ্টা করা হয়নি।

১৬ ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলো। আমি তখন গ্রামে ছিলাম। অনেক জায়গায় শুরু হলো বাঙালিদের ‘বিহারি’ হত্যা; তাদের বাড়ি-ঘর, গাড়ি, দোকান এবং ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান দখল করা হলো। কয়েকদিনের মধ্যে মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের জনপ্রতিষ্ঠান পাল্টে গেল। এই দুই অবাঙালি-অধ্যুষিত এলাকার বাড়ির মালিক হয়ে গেলেন বাঙালিরা। তারা নানা রকম ‘মুক্তিযোদ্ধা’; কেউ প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা, ৯ মাস ভারতে ছিলেন। কেউ ষোড়শ ডিভিশনের সদস্য। সবার হাতেই পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র। অবশ্য কেউ কেউ ছিলেন ‘আসল’ মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ, আরো স্পষ্ট ভাষায় মানবতাবিরোধী অপরাধ, হয়েছে অনেক। মোটের ওপর তখন বাঙালিদের জীবনে একটা বিপর্যয় নেমে এসেছিল। এর আগে এমন কিছু ঘটেনি। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা লুটপাট, খুন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ করেছে লাখ লাখ মানুষের উপর। এই সব অপরাধের জন্য যে সব দায়ী, বিজয়ীদের হাতেই তাদের বিচার হবে, এটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষের যোদ্ধারা একে অপরকে হত্যা করে। যুদ্ধ মানেই হত্যা। কিন্তু নিরস্ত্র অসামরিক ব্যক্তি বা বন্দী সামরিক-অসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অপরাধ। ১৯৭১ সালে এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে অনেক।

আমি ২০০৯ সালে করাচিতে বসে কথা বলছি। ১৯৭১ সালের পর অনেক অবাঙালি বাড়ি-ঘর, সম্পদ-সম্মান হারিয়ে করাচিতে এসেছেন। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৮ বছর পার হয়ে গেছে। এতদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়নি। ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে স্বাধীনতাবিরোধীদের জেল থেকে মুক্তি দেয়।

১৯৭৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব লাহোরে গেলে বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান যাদের মধ্যে ছিলেন গণহত্যার নির্দেশদাতা জেনারেল টিক্কা খান। শেখ মুজিব ও টিক্কা খানের হাসিমুখে করমর্দনের ছবি পত্রিকায় দেখে অনেকেই মর্মাহত হয়েছিলেন। মুজিবের এই সফরের ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ দর-কষাকষির ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। এরপরই ভারতে আটক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যর্পণ শুরু হয়। এই সঙ্গে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীও মুক্তি পায়। অবশ্য টিক্কা খানকে যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় রাখা হয়নি।

প্রশ্নের জবাবে আমি বলেছিলাম, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায় আছে উভয় পক্ষেরই। কিছু প্রতীকী বিচার করে একটি সংশোধনের জানালা খুলে দেয়া উচিত। আমাকে খুব সাবধানে শব্দ বাছাই করে কথা বলতে হয়েছিল।

আমরা জানি, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘মুক্তিযোদ্ধাদের’ ‘দায়মুক্তি’ বা ‘ইমিউনিটি’ দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ তাদের দ্বারা সংঘটিত কোনো কিছু ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে ‘বিহারিদের’ বাড়ি-দোকান দখল করা বৈধ হয়ে যায়। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মতিঝিলে শেখ ফজলুল হক মনি উর্দু দৈনিক পাসবানের অফিস ও প্রেস দখল করে দায়মুক্তি পেয়ে যান। সেখান থেকে তিনি বাংলার বাণী পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন।

সেদিন থেকে দেশে দায়মুক্তির ধারা চলে আসছে। ১৯৭৪ সালে জাতীয় রক্ষীবাহিনীকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল। এটি সরকারের প্রাইভেট বাহিনীর মতো ছিল। এই বাহিনীর আদলেই শেখ হ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *