মধ্যাহ্নের অলসতায় আচ্ছন্ন গুরুওয়েলা থেকে আরও ৩৯ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আজকের গন্তব্য মাহিয়াঙ্গানায়ে পৌঁছালাম। পাহাড়ের কোলে-পাশে মেঘজাল আজ ভেঙে গেছে। কিন্তু বাম পাশে তখনও উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়। সমতল উপত্যকা তরঙ্গের মতো বয়ে যাচ্ছে আমাদের দুই পাশে। এ পথে অনেক পাহাড়ই অতিক্রম করেছি। অনেক পাহাড় আরও বাকি।
পাহাড়ের রূপ সব সময়ই দূর থেকে সুন্দর। দূর থেকেই এর কাঠামো আর সৌন্দর্য দৃশ্যমান। কিন্তু পাহাড় আরোহণে আছে অন্য এক আনন্দ। নিজের সামর্থ্যকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ছুঁড়ে দেওয়ার মতো আনন্দ। আর সেটা পেরিয়ে যাওয়ার পর যে আনন্দের ঝিল্লিমিল্লি সঞ্চার হয় তা বোধহয় অন্য কিছুতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
পথচলায় আমাদের আলোচনার বিষয়েরও অভাব নেই। রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, অ্যাডভেঞ্চার কিংবা নির্বাসনে গেলে কোন পাঁচটা বই সঙ্গে নেব, এ রকম আলোচনা হামেশাই হচ্ছে। পথচলার কষ্ট এসব আলোচনা অনেকটুকুই লাঘব করে। আজ পথে বেশ টিয়া আর মাছরাঙা চোখে পড়ছে। পাশের কালো মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য একাশিয়া গাছ।
আমাদের ডান পাশে রয়েছে ইলেকট্রিক বেড়া। মূলত হাতিকে বাঁচাতেই বানানো হয়েছে বেড়াগুলো। এক জায়গায় এসে রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বি-৩১২ রাস্তা ছেড়ে এবার হাঁটব বি-২৭৪ রাস্তায়। রাস্তা এবার উঁচু-নিচু আর আঁকাবাঁকাও। পথে একটা ভূমিধসপ্রবণ রাস্তা পড়ে গেল। আরো একটু এগোলে সামনে সাপের মতো গা এলিয়ে আছে এক বিশাল পাহাড়। পাহাড়ের ঢালু অংশটি মাথার ব্যান্ডের মতো সরু আর বাঁকুড়ে।
মোরাগাহাউলপাথা এলাকায় অসংখ্য হোটেল। চড়াই শেষে এবার পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে বেশ আরাম লাগছে। কিছুটা এগিয়ে উইলগামুওয়া। আরও বেশ কিছুটা এগোলেই রয়েছে হেঠিপোলা নামক বড় জনপদ। পথের ধারে দেখা দিল বেশ সুন্দর একটি খাল। আজও কয়েকটা ময়ূর চোখে পড়ে খেতে।
হাঁটতে-হাঁটতে চোখ পড়ে যখন চারদিকে, তখন আশেপাশের অনেক কিছুই দেখা যায়। কিন্তু সেই দেখায় মনটাও থাকতে হয়। চোখ, কান আর মন, দেখে তিনজন! আমাকে আবার দিন শেষে লিখতেও হয়। মনের সঙ্গে তখন সঙ্গী হিসেবে নিতে হয় কালি ও কলমকে। তবে এখনকার দিনে মোবাইল, কি-প্যাড আর মন, লেখে তিনে মিলে!
বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত এই পদব্রজ ভ্রমণের একাদশ দিন এভাবেই কেটে গেল।