• সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ন |

বয়সে ৬৩ থেকে ৬৭: এভারেস্টের পথে আমরা

এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পের (ইবিসি) অভিযান মধ্যবয়স্কদের কাছেও দূরের রূপকথার গল্প বলে মনে হয়। তিনজন বাংলাদেশী এই বয়সে হিমালয় অভিযানে গিয়ে দুই সপ্তাহ পাহাড়ি পথ হেঁটে ইবিসি অভিযান শেষ করেন। ষাটোর্ধ্ব বয়সে হিমালয়ে অভিযানের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন অভিযাত্রীদের অন্যতম আইফতেখারুল ইসলাম।

দ্বিতীয়বার ইবিসিতে যাচ্ছি, এই ভাবনা অন্যদের জানালে সবাই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবে। আমার বয়স ৬৭ পার হয়েছে। তবু এবার ইবিসি ট্রেকের সঙ্গে অমা দাবলাম বেজ ক্যাম্প যোগ করেছি। একটা নতুন লক্ষ্যের কথা বললে যাওয়ার যুক্তি জোরালো হয়। ফাঁক দিয়ে টুক করে ইবিসিটাও আরেকবার ঘুরে আসতে পারব।

এবার যোগ দিয়েছেন জালাল আহমেদ ও এনাম চৌধুরী। এভারেস্ট-দর্শন তাদের স্বপ্ন। দুজনেই নিজ নিজ কাজে খ্যাতিমান, প্রতিষ্ঠিত। দুজনেরই বয়স আমার চেয়ে কম, ৬৩ থেকে ৬৪ বছর। আমিও তো ঠিক ওই বয়সেই প্রথমবার ইবিসিতে গিয়েছিলাম। তাহলে এঁরাও পারবেন। কয়েক মাস খাওয়া কমিয়ে, অতিরিক্ত হেঁটে ওজন কমিয়ে তৈরি হয়েছেন তারা। ট্রেকিং বুট, পোশাক ও অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছেন।

ইবিসি মাঝারি ধরনের কষ্টকর ট্রেক। তা-ও তিন বয়োজ্যেষ্ঠের পক্ষে ১৫ থেকে ১৬ দিনের ট্রেকে সুস্থ থেকে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতায় পৌঁছাতে পারা সহজ কাজ নয়। এই ট্রেকে কয়েকটা দীর্ঘ আরোহণের দিন আছে। কাঠমান্ডু থেকে ১৭ এপ্রিল ভোরে সীতা এয়ারের ছোট বিমানে লুকলায় পৌঁছাই। এখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন হরি, আমাদের গাইড। সঙ্গে পোর্টার।

লুকলা থেকে ফাকদিং ট্রেক তুলনামূলকভাবে সহজ। সকালে পথে নেমে দেখি চমৎকার রোদ, দূরে ঝলমল করছে চেনা পর্বতশিখর। গত কয়েক বছরে দুবার এ পথে ট্রেক করেছি বলে এটা আমার চেনা।

কিছুক্ষণ ট্রেক করে চলার পর দুধকোশি নদীর কলস্বর শুনতে পাই। মাঝেমধ্যে দেখি পার্বত্য নদীর দুধসাদা স্রোত কীভাবে পাথরের ওপর আছড়ে পড়ছে।

পরের দুদিন পথে বেশ কটা ঝুলন্ত সেতু পার হতে হয়। অনেকটা চড়াই ধরে ওপরে উঠে হিলারি ব্রিজ পার হই। এবারের ট্রেকে প্রতিদিন আবহাওয়া ভালো বলে নিচের নদী, চারপাশের পাইনবন আর দূরের পর্বতশিখর দেখা গেছে সারাক্ষণ। এমনকি নামচে বাজার পৌঁছানোর আগেই দুটো জায়গা থেকে আমরা এভারেস্ট দেখতে পাই। অনেক দূরে সে শিখর, ছোট কিন্তু স্পষ্ট। নামচে বাজারে সাগরমাথা মিউজিয়ামের বাইরে ৩ হাজার ৪৪০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে বিশ্বাস হয়, আমরা তিন প্রবীণ সত্যিই এভারেস্টের পথে ট্রেক করে চলেছি।

সকালে তিন অভিযাত্রী একসঙ্গে ট্রেকিং শুরু করলেও যার যার গতিতে চলি আমরা। কখনো পাথর ডিঙিয়ে চড়াই ধরে উঠি, কখনো পাইনবনের ভেতর হাঁটি। নীল আকাশের গায়ে খানতেগা, কুসুমখ্যাং, থামশেরকু, অমা দাবলাম, লোৎসে ও এভারেস্ট দেখে ছবি তোলার জন্য দাঁড়াই। কোনো লজে হানি জিঞ্জার লেমন চায়ের জন্য বিরতি নিই। তিনজন একত্র হই। ছবি তুলি। আবার ট্রেক শুরু করি। উচ্চতার কারণে বাতাসে অক্সিজেন কমে আসছে। ওপরে ওঠার সময় আমরা অল্পেই হাঁপিয়ে উঠি। বিরতি নিই। ওপরে-নিচে তাকিয়ে দেখি সঙ্গীরা কে কোথায় আছেন।

নামচে থেকে ট্যাংবোচে হয়ে দেবুচে। সেখানে সূর্যাস্তে স্বর্ণকেশী অমা দাবলাম দেখি। পরের দিন সকালে তিন ঘণ্টা ট্রেক করে আমরা পৌঁছাই ৪ হাজার মিটারে প্যাংবোচে। ইবিসিতে যেতে এখানে থামার দরকার নেই। আমরা থামছি, কারণ আমার প্রথম লক্ষ্য অমা দাবলাম বেজ ক্যাম্প এখান থেকে কাছে। জালাল ভাই ও এনাম ভাইয়ের লক্ষ্য শুধু ইবিসি। ২৩ এপ্রিল তারা অ্যাক্লাইমেটাইজেশন হাইক করে উঁচুতে একটা গ্রাম দেখে এলেন। আমি গেলাম অমা দাবলাম বেজ ক্যাম্পে।

তাপমাত্রা সেদিন হিমাঙ্কের নিচে। কোথাও চড়াই। কোথাও প্রবল বাতাস। প্যাংবোচে থেকে উঠে আসার পর বেজ ক্যাম্প পর্যন্ত কোনো টি-হাউস নেই। তিন ঘণ্টার ট্রেক শেষে ৪ হাজার ৬০০ মিটার উঁচুতে বেজ ক্যাম্প। বাতাসে ক্যাম্পের পতাকা ও প্রেয়ার ফ্ল্যাগ পতপত করে উড়ছে। এত সুন্দর জায়গা ছেড়ে তক্ষুনি ফিরতে ইচ্ছা করে না। একটা তাঁবুতে বসে মাতা-কন্যার যুগল শিখরের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে। অমা দাবলাম অর্থ মায়ের গলার হার।

পরদিন থেকে আবার আমাদের মূল লক্ষ্যের দিকে মন দিই। দিনে দুবার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ও পালস মেপে দেখা হয়। জালাল ভাই ও এনাম ভাইয়ের শরীর ভালো আছে। কারোরই উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, মাথাব্যথা, বুকে ব্যথা, বমি এসব লক্ষণ নেই। ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হলেও দুজনেই দারুণ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *