• শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন |

লালনের পদে সার্বজনীনতা

**বাউল শাহেনশাহ লালন**

১৭ অক্টোবর, ২০২২ তারিখে বাউল ও ভক্ত কবি লালন সাঁইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী। আর এবারই তাঁর ২৫০তম জন্মবার্ষিকীও। বাংলা ভাব আন্দোলনে এই মহান মানুষের অসীম প্রভাব রয়েছে।

**দর্শন ও তত্ত্ব**

“লালন সাঁই” নামটি বাঙালির অন্তরের সাধনার, সঙ্গীতের ও জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কঠোর সমাজব্যবস্থা ও গোঁড়ামি আর জাতপাতের বিভাজনে জর্জরিত একটি সমাজে জন্ম নিয়েও খোলামেলা চিন্তাভাবনা ও অগ্রগামী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে লালন আলোকিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রকাশ পেয়েছেন। তিনি ছিলেন নিম্নবর্গের মরমী ও দুঃখীর সহায়ক ও পথপ্রদর্শক। শাস্ত্র বা ধর্ম নয়, মানুষই ছিল তাঁর আরাধ্য। গান ছিল তাঁর উপদেশ। একদিকে যেমন তাঁর গান গভীর সাধনার প্রকাশ, তেমনি পীড়িত সমাজের বক্তব্যও। আবার কাব্য ও সঙ্গীতের গুণেও সেই গানগুলি অতুলনীয়। অনন্য মানবিক দর্শন ও মরমি সঙ্গীতের জন্য তিনি আজ বিশ্বের মানবিকতাবাদীদের অনুপ্রেরণার উৎস। এই দারিদ্র্যগ্রস্ত দেশে লালন বাঙালির হৃদয়চেতনায় একই সঙ্গে মরমী ও দ্রোহী।

**জীবন ও সাধনা**

লালন জন্মগ্রহণ করেছিলেন ২৫০ বছর আগে একটি অখ্যাত গ্রামে। তিনি ১১৬ বছরের দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন। অভিজ্ঞতাময় এই দীর্ঘ জীবনের বড় অংশ ছিল কষ্ট ও আশ্চর্যে পূর্ণ। জাতপাত, সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ, শাস্ত্র-ধর্মের অসহ্য দম্ভ, শ্রেণিবৈষম্য, সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, সামাজিক অনাচার, নারী নিপীড়ন, মানবতার অবমাননা, মানুষের জীবনকে স্থবির ও বিষণ্ণ করে রেখেছিল। লালনের কালের দুই শতক পরেও এই পরিস্থিতি বদলায়নি। কোনো ক্ষেত্রে হয়তো এর রূপ বদলেছে, পরিবর্তিত হয়েছে শোষণ-নিপীড়নের পন্থা; কিন্তু সমাজের উপর এর ছাপ পুরোপুরি মুছে যায়নি।

লালনের সাধকজীবন দুই ভাগে বিভক্ত: মরমি সাধনার শান্ত স্রোত ও দ্রোহের অগ্নি। কিন্তু যে সাধনার ভুবনে তিনি প্রবেশ করেছিলেন, তা বাইরের জগতের ঘটনায় আলোড়িত হওয়ার কথা ছিল না। তবে কেন বাউলকে প্রতিবাদী ও দ্রোহী হতে হল? মূলত বাউলদের জন্মই প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে, উচ্চবর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করে—ক্ষমতাশালী ও বিত্তবানদের বিপরীতে এটি ছিল গরিব-গণমানুষের নীরব বিদ্রোহ। মরমি সাধনা যারা গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা সমাজের নিগ্রহ তথা অবজ্ঞার হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে তাঁরা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করার তাগিদ অনুভব করেছিলেন মনে মনে। তাই বাউলদের কোনো শাস্ত্র নেই—গুরুর নির্দেশ-নিষেধই গান হয়ে তাঁদের পথ দেখায়, দিশা দেয়। লালনের জীবন ও সাধনাও চলেছে এই ধারায়।

**প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ**

বারবার আঘাত এসেছে বাউল সম্প্রদায় ও লালনের ওপর। বাউল-তাচ্ছিল্যের পরিচয় মিলবে মধ্যযুগের দু-একটি পুঁথি বা পদে। ওয়াহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনের ফলে বাউলদলন জোরালো হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় উত্তরকালে জারি হয় ‘বাউল ধ্বংস ফত্ওয়া’—রচিত হয় ভণ্ড ফকির, রদ্দে নাড়া, জওয়াবে ইবলিস-এর মতো পুস্তক-পুস্তিকা। আক্রান্ত হন লালন। লালন সম্পর্কে যে অবজ্ঞা-নিন্দা-বিদ্বেষ, সে এক অর্থে বিকৃত সমাজমনেরই প্রতিক্রিয়ার ফসল। লালন ছিলেন মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী, ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন মানবতাবাদী দর্শনকে, ঘুণে ধরা সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছিলেন, জাত-ধর্মকে দূরে সরিয়ে মানুষকে মানবিক বোধে বিকশিত করার ব্রত নিয়েছিলেন। সামান্য মরমি ফকিরের এসব উল্টো ধারার কর্মকাণ্ড বরদাশত করবেন কেন সমাজের উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী মানুষ! কারণ ধর্মের সাহায্যে—শাস্ত্রের নামে—অর্থের জোরে—শক্তির দম্ভে সমাজ–ঘরের সব জানালা তাঁরা বন্ধ করে চিরস্থায়ী এক আঁধারের রাজ্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন। লালন তাতে বাদ সেধেছিলেন বলেই তিনি আলোর ঝলক সইতে না-পারা পেচক প্রজাতির মানুষের দুশমন হয়েছিলেন। পাষণ্ড, ব্রাত্য, ন্যাড়া, জারজ—এসব কুকথা তাঁকে শুনতে-সইতে হয়েছে। তবে আরোপিত কলঙ্ক আর নিন্দা সমকালেই—উত্তরকালে তো বটেই—মুক্তচিন্তার বিবেকবান মানুষের সুবিবেচনার কল্যাণে লালনের গৌরবচিহ্ন হয়ে উঠেছিল।

**সাধনার গান এবং সমাজচেতনা**

লালনের তো শুধুই লেখার কথা ‘তিরপিনির তিরোধারে মীনরূপে সাঁই খেলা করে’, ‘আয় হারালি আমাবতী না মেনে’, ‘গেড়ে গাঙেরে খ্যাপা হাপুরহুপুর ডুব পাড়িলে’, ‘ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে’, ‘আজব আয়নামহল মণি-গভীরে’ কিংবা ‘ধর রে অধরচাঁদেরে অধরে অধর দিয়ে’—এসব সাধনার গান, জটিল বাউলতত্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *