• সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৭ অপরাহ্ন |

সালাহ উদ্দিনকে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারের প্রতি মির্জা ফখরুলের আহ্বান

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন ও হামলা-মামলার অন্যতম শিকার সালাহ উদ্দিন আহমেদ। এ সময় তিনি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে অবিলম্বে সসম্মানে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বৃহস্পতিবার (৯ মার্চ) বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনারা জানেন, সালাহ উদ্দিন আহমেদ বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও কেন্দ্রীয় সংসদের এককালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের উত্তাল সরকার বিরোধী আন্দোলনকে দমানোর জন্য গত ১৫ সালের ১০ মার্চ রাত প্রায় ১০ ঘটিকার সময় আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কিছু সাদা পোশাকধারী সশস্ত্র সদস্যরা উত্তরার এক বন্ধুর বাসা থেকে আমাদের নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে তুলে নিয়ে যায় এবং দীর্ঘ ৬১ দিন অজ্ঞাত স্থানে তাকে গুম করে রাখা হয়। পরে ১০ মে চোখবাঁধা অবস্থায় একটি গাড়িতে করে তাকে দীর্ঘ পথযাত্রা করিয়ে, ১১ মে ভোররাতে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ের গলফ লিংক রাস্তার উপর ফেলে রেখে যায়।’

‘সালাহ উদ্দিন আহমেদ নিজেই চোখ খুলে স্থানীয় পথচারীদের সহায়তায় শিলং পুলিশের কাছে তার পরিচয় এবং বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরলে পুলিশ তাকে ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬-এর বিধানমতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেফতার করে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমেদ ভারতের আদালতে বিচারকালীন রাষ্ট্রপক্ষের সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ মোকাবেলা ও খণ্ডন করে এবং নিজের পক্ষে ৭০টি দালিলিক প্রমাণ ও সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে তিনি বাংলাদেশে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকধারী কিছু সশস্ত্র ব্যক্তির দ্বারা অপহরণ ও গুম হয়েছিলেন। এবং উক্ত অপহরণকারীরা তাকে চোখবাঁধা অবস্থায় সেখানে ফেলে রেখে আসে। ভারতীয় আদালত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সমস্ত সাক্ষ্য ও দলিলসমূহ পর্যালোচনা করে তাকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন এবং তাকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করানোর জন্য ভারত সরকারকে নির্দেশনা প্রদান করেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে ভারত সরকার আপিল করলে মাননীয় আপিল আদালতও বিচারিক আদালতের বেকসুর খালাসের রায় ও প্রত্যাবর্তন করানোর নির্দেশনার আদেশ বহাল রাখেন।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমেদ আইনজীবী ছিলেন, এক সময়ের বিচারক ছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন, এমপি-মন্ত্রী ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনে কোনো কালিমা লাগেনি। তিনি বর্তমানে বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য। বিএনপি’র ২০১৬ সালের কাউন্সিলে তিনি বিএনপি নীতিনির্ধারণের শীর্ষ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সালাহ উদ্দিন আহমেদ বিগত দীর্ঘ আট বছর যাবত ভারতে মিথ্যা মামলা মোকাবেলা করে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। ভারতীয় আদালতে তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে অভিযুক্ত করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তিনি বিচারিক আদালত ও আপিল আদালতের রায়ে বেকুর খালসপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার বেকসুর খালাসের রায়ের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশের এই অবৈধ সরকার চক্রান্ত করে সীমাহীন নির্যাতন ও হয়রানি করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা অবগত আছেন যে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে অপহরণ ও গুম করার পর তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করার জন্য অনেকবার চেষ্টা করেও পুলিশী অসহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হন। অতঃপর মাননীয় হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করলে আদালত সালাহ উদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করার জন্য সরকারকে নির্দেশনা দেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিশ্বের প্রায় সকল মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং তার মুক্তি ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের কার্যালয় প্রেস ব্রিফিংয়ে তার বিষয়টি উত্থাপন করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অধিকার, আইন ও শালিস কেন্দ্রসহ বাংলাদেশের সকল মানবাধিকার সংগঠন উক্ত সময়ে প্রতিনিয়ত বিবৃতি দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উক্ত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। দেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ সকল গণমাধ্যম প্রায় প্রতিদিন এ বিষয়ে সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এ বিষয়ে সোচ্চার ছিল। নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে সংবাদ প্রচার করে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আর্লি ডে মোশানে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের সংশ্লিষ্ট সাব কমিটিতে কংগ্রেশনাল টেস্টিমোনি দেয়া হয়। বাংলাদেশে অবস্থিত প্রায় সকল গণতান্ত্রিক দেশের দূতাবাসকে এ বিষয়টি অবহিত করা হলে তাদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত কূটনৈতিক সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়া যায়।’

‘আপনাদের সকলের আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতা এবং উল্লেখিত সকল মহলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাকে আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি,’ বলেন মির্জা ফখরুল।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বাংলাদেশের সূর্যসন্তান, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম ভ্যানগার্ড, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদকে অবিলম্বে আমাদের মাঝে ফেরত চাই। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অবিলম্বে বাংলাদেশের এক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে অবিলম্বে সসম্মানে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

পরিশেষে তিনি বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। তাকে বিনা কারণে অন্যায়ভাবে দীর্ঘ আট বছর ভারতের কারাগারে ও নজরবন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। তাকে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বেকসুর খালাস দেয়ার পার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের। আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, সালাহ উদ্দিন আহমেদকে মুক্ত অবস্থায় অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *